হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের কান্না

প্রতিনিধি | জাতীয়

রবিবার ২৩ এপ্রিল ২০১৭|০৭:৩৩:০৭ মি.

কেউ যেন শুনতে পাচ্ছে না হাওরপাড়ের অর্ধকোটি মানুষের কান্না। সরকারের নীতিনির্ধারকরা কিংবা বেসরকারি কোনো সংস্থা। ভারতের পানিতে ফসল হারানো ৭ জেলার হাওরের মানুষের দুর্দশার চিত্র মিডিয়ায়ও ঠিকমতো আসছে না।
পানিতে ফসল হারিয়ে দিশাহারা হাজার হাজার কৃষক। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে হাওরে বসবাসরত আবালবৃদ্ধবনিতা তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে সেখানের আকাশ-বাতাস। তাদের পাশে কেউ নেই।

 

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বালিজুরি গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম (আমির মেম্বার) ছলোছলো চোখেই বললেন, 'বানের পানিতে গরু-ছাগল গেলোগি, আশা করছিলা ছয় মাস মাছ ধরি সংসার চলাইতাম, কিন্তু সে আশায়ও গেলোগি।'
শুধু আমির মেম্বর নয়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলার হাওর উন্নয়ন বোর্ডের অধীনস্থ ৪৮টি উপজেলার (মোট উপজেলা ৭০) মানুষের মধ্যেই এই হাহাকার-আর্তি।
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কোথাও পানি নেমে যাওয়ায় পচে যাওয়া ধানগাছের গুমোট গন্ধ। মাঝে মাঝে পানিতে মাছ, হাঁস মরে পড়ে থাকার দৃশ্য। উঁচু এলাকায় দু'চারটি ধানী জমিতে ধান দেখা পাওয়া গেলেও কারো মুখে হাসি নেই। ফসল হারানোর যন্ত্রণায় সবাই যেন দিশাহারা। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা এখন আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া কিছুই করতে পারছেন না। যে বিস্তীর্ণ এলাকা পানি থই থই করতো, মাছ ধরার কলরব উঠতো, সেই এলাকায় সুনশান নীরবতা। চিরচেনা হাওর এখন যেন অচেনা এক বিরাণভূমি।
দেশের উত্তর-পর্বাঞ্চলের ৭ জেলার প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬১ হেক্টর জমি হাওর এলাকায়। হাওর বোর্ডের হিসাব মতে, মোট হাওরের সংখ্যা ৩৭৩টি। সুনামগঞ্জে ৮৫, হবিগঞ্জে ১৪, নেত্রকোনায় ৫২, কিশোরগঞ্জে ৯৭, সিলেটে ১০৫, মৌলভীবাজারে ৩ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৭টি হাওর রয়েছে। এই এলাকায় ৩৭৩টি হাওরের মাঝে ৪৭টি বড় হাওর রয়েছে। হঠাৎ ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে সুনামগঞ্জের ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫৩১ হেক্টর, হবিগঞ্জের ১ লাখ ৯ হাজার ৫১৪ হেক্টর, নেত্রকোনার ৭৯ হাজার ৩৪৫ হেক্টর, কিশোরগঞ্জের ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৩ হেক্টর, মৌলভীবাজারের ৪৭ হাজার ৬০২ হেক্টর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৯ হাজার ৬১৬ হেক্টর হাওরের জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অশ্বখুরাকৃতি-বাটির মতো নিম্নাঞ্চল।
হাওর অঞ্চল ঘুরে মনে হলো সর্বত্রই দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনী ব্যবস্থা না নিলে হাওর জনপদের অধিবাসীরা দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রপ্রেণা, কিশোরগঞ্জ এলাকার প্রায় ৩ কোটি মানুষ এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ফসল হারিয়ে ভাটি অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের দিন কাটছে এখন অর্ধাহারে-অনাহারে। নিরুপায় হয়ে অনেকেই জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা, তাহিরপুর, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, দিরাই শাল্লার মানুষেরা কাজের সন্ধানে ঢাকা চট্টগ্রাম মহানগরীর পথে। ধর্মপাশা উপজেলার বেশিরভাগ অসহায় মানুষ ঢাকার কেরানীগঞ্জ, আবদুল্লাহপুর, কামরাঙ্গীরচর, গাজীপুরে বিভিন্ন কাজের সন্ধানে আশ্রয় নিয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। অনেকেই গরু-ছাগল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে তারা জানান, জীবন বাঁচাতেই গরু-ছাগল বিক্রি করছেন। তাছাড়া ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গরুকে খাওয়ানোর জন্য খড়ও পাওয়া যাচ্ছে না। সে জন্যই অর্ধেক দামে গবাদিপশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. জহির বিন আলম বলেন, 'সাধারণত আগাম বন্যা আসে এপ্রিলে। এ বছর মার্চে চলে এসেছে, এ সময়টাতে ফসলে কীটনাশক ছিটানো হয়। আগাম বন্যা আসায় সেই কীটনাশক পানিতে মিশে গেছে। যে কারণে অ্যামুনিয়া গ্যাসের প্রভাবে পানিতে অক্সিজেন কমে বিষক্রিয়ায় মাছ মরছে। মাছ খেয়ে হাঁস ও পাখি মরছে। এখন অধিক বৃষ্টি হলে পানি বাড়বে, গ্যাসের প্রভাব কমবে। নতুবা পানিতে প্রচুর পরিমাণে বিচিং দিয়ে বাতাস মেলাতে হবে। অন্যথায় হাওরাঞ্চলে আমাদের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষের মাঝেও এর প্রভাব পড়বে।

মাছ খেয়ে মারা যাচ্ছে
খামারিদের হাঁস
মৌলভীবাজার সংবাদদাতা জানান, মৌলভীবাজারের হাকালুকি পাড়ের মানুষের গলায় এখন ঋণের ফাঁস। কড়ালগ্রাসী বানের পানি ধান নিলো, মাছ নিলো, এবার নিচ্ছে হাঁস। বোরো চাষি ও মৎসজীবীদের পর হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন হাকালুকি হাওরপাড়ের হাঁসের খামারিরা।
সবুজ ঘাস আধা পাকা ও কাঁচা বোরো ধান পচে পানিতে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের আক্রান্ত হয়ে মাছ মরতে শুরু করে। পানিতে ভাসতে থাকা মরা মাছ বাতাসে ঠেলে কিনারায় নিয়ে আসে, আর সেই মাছ খেয়ে এখন হাকালুকি হাওরে মারা যাচ্ছে হাঁস।
হাকালুকি হাওরে গত কয়দিনে শত শত হাঁস মারা গেছে বলে দাবি খামারিদের। তবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আছে মরা হাঁস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। এ ব্যাপারে হাঁসের খামারিদের সতর্কতা অবলম্বন করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওরপাড়ে অসংখ্য হাঁসের খামার রয়েছে। এসব খামারের উৎপাদিত ডিম স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে অন্যত্র সরবরাহ করা হতো। চৈত্র মাসে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে নেয় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা। কৃষকের লাগানো আধা পাকা ও কাঁচা বোরো ধান বানের পানিতে ডুবে যায়। কয়েকদিন পানির নিচে থাকলে আধা পাকা ও কাঁচা বোরো ধান পচে পানিতে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের সৃষ্টি হয়। গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মাছ মরতে শুরু করে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীরা। পানিতে ভাসতে থাকা মরা মাছ বাতাসে ঠেলে কিনারায় নিয়ে আসে। আর সেই মাছ খেয়ে এখন হাকালুকি হাওরে মারা যাচ্ছে হাঁস।
বানের পানি ধান নিয়েছে, মরে গেছে মাছ। অভাবের সংসার হাঁসের ডিম বিক্রি করে চালাতেন অনেকে। হাঁস মরে যাওয়ায় নিঃস্ব খামারিরা এনজিও থেকে তোলা ঋণ কিভাবে শোধ করবেন এ নিয়ে চরম হতাশায় রয়েছেন।
শনিবার হাকালুকি হাওরের গাওর বিল, কাংলি, গুফরকুড়ি, হাটকুড়ি, কটাইর বিল, বগলা কুড়ি এলাকায় গেলে অনেকের সাথে কথা হয়। এলাকার আসিদ মিয়া জানান, ধান ও ঘাস পচে পানিতে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত পচা মাছ ও পোকা খেয়ে হাঁস মারা যাচ্ছে। তার ৩০০টি হাঁসের বাচ্চার মধ্যে ১০০টি মারা যায়।
হাওরপাড়ের সিংনাথ গ্রামের জয়নাল আবেদীন বলেন, 'করাল গ্রাসী বানে ধান নিল, মাছ নিল, এখন হাঁসও নিচ্ছে। আমার ২০০ হাঁস মারা গেছে। আমাদের তো আর কিছু বাকি নেই।'
হাকালুকি হাওরপাড়ের মনা মিয়া এলাকায় ১২টি হাঁসের খামার রয়েছে। মোট ৩০০০ হাঁস রয়েছে। খামারিরা ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খামার করেছেন। এ ঋণ এখন তাদের গলায় ঋণের ফাঁস হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
হাওরপাড়ের আশিঘরের নজরুল ইসলাম বলেন, 'পত্রিকায় লিখলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা তেমন কিছুই পায় না। দলীয়করণ ও আত্মীয়করণে লুটপাট হয়ে যায়।' তাহিন মিয়া জানান, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ ৬০০ হাঁস পালন করেছিলেন। ২৫০টির মতো মারা গেছে এখন ব্যাংকের কিস্তি চালাবে কীভাবে- এমন চিন্তায় বিভোর।
কুলাউড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাইফুদ্দিন আহমদ বলেন, পানিবাহিত রোগে হাঁস মারা যেতে পারে । শুধু গ্যাসে আক্রান্ত পচা মাছ ও পোকা খেয়ে হাঁস মারা যাচ্ছে। হাঁসের মড়ক ঠেকাতে খামারিদের সতর্ক থাকতে বলেন তিনি। কতটি হাঁস মারা গেছে এমন তথ্য তার কাছে নেই।
এদিকে মৌলভীবাজার জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ডা. মো. হিদায়াতুল্লাহ জানান, হাওরে কী পরিমাণ হাঁস মারা গেছে, এর কোনো পরিসংখ্যান মেলেনি। ধান নষ্ট হওয়ার পর মাছ ও হাঁস মারা যাওয়ায় হাওরপাড়ের মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তিনি।
ঢাবির প্রতিনিধি দল
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, অকাল বন্যায় ধান পচে সৃষ্ট গ্যাসে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে মাছ ও জলজপ্রাণীর অস্বাভাবিক মড়কের কারণ খতিয়ে দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একটি প্রতিনিধি দল কাজ শুরু করেছে।
শনিবার সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন হাওরে পানি-মরা মাছসহ জলজ জীব ও উদ্ভিদ প্রজাতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করেছেন তারা।
এর আগে শুক্রবার হাওরের পানি ও মাছ পরীক্ষা করে গেছে বাংলাদেশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল।
হাওরে মাছ ও হাঁসের মড়কের জন্য ফসলের মাঠে ব্যবহার করা কীটনাশকও একটি কারণ বলে মনে করছে এই গবেষক দল।
তারা বলছেন, বন্যার পানি ফসলের মাঠ ডুবিয়ে দেয়ায় কীটনাশক ও এসিড ছড়িয়ে পড়েছে।
হাওরের পানি পরীক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজমল হোসেন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, অন্যান্য এলাকা থেকেও এসিডিটি ও কীটনাশক পানির সঙ্গে আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। যার ফলে মাছের মড়ক দেখা দিয়েছে। ধানের পচা দুর্গন্ধ থেকে মানুষের শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এটা সাময়িক।
দলটি আরও জানিয়েছে, জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আধার মাছের অভয়াশ্রম বিশ্ব ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ও জলজপ্রাণী মারা গেলেও অন্য হাওরের তুলনায় তা কম। তবে হাওরের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, অসময়ে তলিয়ে যাওয়া হাওরগুলোর মধ্যে কয়েকটি হাওরে মাছ মরে ভেসে ওঠে। হাওরে ধান পচে সৃষ্ট বিষাক্ত গ্যাসে মাছে মড়ক লাগায় গত বৃহস্পতিবার থেকে সুনামগঞ্জের হাওরে আগামী এক সপ্তাহের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়।

পাঠকের মন্তব্য Login Registration